রাত তখন ৮টা। ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট—সন্দ্বীপ চ্যানেলের চরে আটকা পড়েছে ফেরি ‘কপোতক্ষ’। ফেরিতে তিন শতাধিক যাত্রী। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক, কণ্ঠে উদ্বেগ। জোয়ার আসবে রাত প্রায় ৩টার দিকে। তার আগে ফেরি ভাসার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ ততক্ষণ ফেরিতেই থাকতে হবে যাত্রীদের।
এর মধ্যেই সামনে আসে আরও উদ্বেগের খবর—ফেরির ক্যানটিনে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানির সংকট। ফলে শুধু ফেরিতে আটকে পড়াই নয়, খাবার-পানি ছাড়া রাত কাটানোর শঙ্কাও দেখা দেয় যাত্রীদের মধ্যে।
কিন্তু এই খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে যায় দৃশ্যপট। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে খালের কাদামাটি মাড়িয়ে খাবার নিয়ে ছুটে আসতে থাকেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। সরকারি দল, বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের এমন উদ্যোগে যেন একসঙ্গে ধরা দেয় মানবিক সন্দ্বীপের চিত্র।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাট থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ফেরি ‘কপোতক্ষ’। নাব্যতা সংকটে কিছুদূর যাওয়ার পর চরের মুখে আটকা পড়ে ফেরিটি।
জানা যায়, ফেরিতে প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীও রয়েছেন। ফেরির ক্যানটিনে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় একপর্যায়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যাত্রীরা। পরে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার উদ্যোগে ফেরিতে থাকা যাত্রী ও স্টাফদের জন্য রাতের রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
এ বিষয়ে এমপির মিডিয়া ম্যানেজার আবুল হাসান ফয়সাল জানান, প্রায় ৫০০ মানুষের জন্য খাবার রান্না করা হচ্ছে। পাশাপাশি সবার জন্য সুপেয় পানিরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতে এসব খাবার যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকেও যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফেরি আটকে পড়ার প্রায় দুই ঘণ্টার মাথায় দলটির নেতাকর্মীরা শুকনো খাবার ও পানি নিয়ে ফেরিতে পৌঁছে তা যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা অধ্যাপক আমজাদ হোসেন পরিচালিত এ.কে ফাউন্ডেশনও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তারাও ফেরিতে থাকা যাত্রীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করেন।
খাবারের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা যাত্রীরা হয়তো কল্পনাও করেননি, মুহূর্তের মধ্যেই দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।
ফেরিতে আটকে পড়া যাত্রী রাকিব বলেন, ‘ফেরি আটকে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় ছিলাম খাবার নিয়ে। কারণ ফেরিতে অনেক বৃদ্ধ ও শিশু রয়েছে। খাবার না পেলে তাদের অনেক কষ্ট হতো। তবে আমরা কল্পনাও করিনি, এত দ্রুত এত মানুষ খাবার নিয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।’
শুধু খাবারের সংকট নিরসন নয়, যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা সন্দ্বীপ ও সীতাকুণ্ড—দুই প্রান্তের ঘাটে পুলিশ পেট্রোল টিম মোতায়েনের আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি ভোররাতে ফেরি থেকে যাত্রীরা নামার পর যাতে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য চট্টগ্রাম প্রান্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ির ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।
এদিকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূইয়া মিল্টনের পক্ষ থেকেও চট্টগ্রাম প্রান্তে নেমে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে দুটি বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ফেরি আটকে পড়ার ঘটনায় একদিকে যেমন নাব্যতা সংকট ও অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিপদের মুহূর্তে দল-মত ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—সন্দ্বীপের মানুষ বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে জানে।
মানবিক সন্দ্বীপ আবারও দেখলো মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।